ঢাকা, বৃহস্পতিবার: রাজধানীর তুরাগের কামারপাড়া ফুলবাড়িয়া বস্তিতে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সাত মাসের শিশু রাফা মনি ওরফে কবিতাকে মাটিতে আছাড় মেরে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার বাবা কবির হোসেনের বিরুদ্ধে। বুধবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যায় পারিবারিক বিরোধের একপর্যায়ে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি শিশুটি বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিকেল ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ঘটনার পর পুলিশ কবির হোসেনকে আটক করে এবং শিশুর মৃত্যুর পর তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে।
নিহত শিশুর মা লিমা আক্তার জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সোনাইডাঙ্গা গ্রামে। বর্তমানে তারা তুরাগের ওই বস্তিতে বসবাস করছিলেন। রাফা ছিল তাদের একমাত্র সন্তান। শিশুটির বাবা কবির হোসেন পেশায় রিকশাচালক হলেও দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন লিমা।
তিনি জানান, মাদক গ্রহণ ও সংসারের দায়িত্ব পালন না করা নিয়ে স্বামীর সঙ্গে প্রায়ই তাদের বিরোধ হতো। ঘটনার দিন সন্ধ্যাতেও একই বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে কবির হোসেন তার স্ত্রীর কাছ থেকে শিশুটিকে নিয়ে মাটিতে আছাড় মারেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রতিবেশীরা দ্রুত এগিয়ে এসে গুরুতর আহত শিশুটিকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে বুধবার মধ্যরাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির মাথায় গুরুতর আঘাত, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং খুলিতে ফাটল ধরা পড়ে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার বিকেলে তার মৃত্যু হয়।
তুরাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মেহেদী হাসান ফয়সাল জানান, ঘটনার খবর পাওয়ার পর বুধবার রাতেই পুলিশ কবির হোসেনকে আটক করে। শিশুর মৃত্যুর পর তাকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এসআই ফয়সাল বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কবির হোসেন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পারিবারিক কলহ ও মাদকাসক্তির প্রভাবে এ ঘটনা ঘটেছে। শিশুটির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কবির হোসেন প্রায়ই মাদক গ্রহণ করে বাড়িতে অশান্তি সৃষ্টি করতেন। কয়েক মাস ধরে পরিবারটিতে নানা ধরনের সংকট চলছিল। প্রতিবেশী শিরিন বেগম বলেন, রাফা খুবই হাসিখুশি শিশু ছিল। কবিরকে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি কারও কথা শুনতেন না।
শিশুটির মা লিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তিনি সন্তানকে রক্ষা করার জন্য চিৎকার করলেও স্বামী তার কথা শোনেননি। স্বামীর অনিয়মিত আয় ও মাদকাসক্তির কারণে সংসারে দীর্ঘদিন ধরে অভাব-অনটন ছিল বলেও জানান তিনি।
এ ঘটনায় মানবাধিকারকর্মী ও শিশুসুরক্ষা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য কার্যকর সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা ও আর্থিক সংকট একসঙ্গে একটি পরিবারের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। তারা মনে করেন, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোতে কাউন্সেলিং, সামাজিক সহায়তা এবং নজরদারি ব্যবস্থা বাড়ানো জরুরি।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। ঘটনার পেছনের কারণ, অভিযুক্তের পারিবারিক ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আদালতের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আমাদের আরও আপডেট পেতে চোখ রাখুন: ফেসবুক: facebook.com/DailyPerspective.tv ইউটিউব: youtube.com/@DailyPerspectivebd ওয়েবসাইট: dailyperspective.tv Instagram: instagram.com/dailyperspective.tv

