কক্সবাজার, ৭ জুলাই: টানা মৌসুমি বর্ষণের মধ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে একাধিক স্থানে পাহাড়ধসে অন্তত আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। একই সময়ে কক্সবাজার পৌর এলাকার একটি পাহাড়ধসের ঘটনায় আরও একজন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নতুন করে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
সোমবার (৬ জুলাই) ভোররাতজুড়ে উখিয়া ও আশপাশের রোহিঙ্গা শিবিরে চারটি পৃথক স্থানে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। উখিয়ার ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাত ৩টার দিকে পাহাড়ধসে একই পরিবারের সদস্যসহ চারজন নিহত হন। নিহতরা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন।
এর আগে রাত ১টা ৪৫ মিনিটে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ধসে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই রাত ১টা ১০ মিনিটে পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস নিহত হন।
অন্যদিকে, কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় ভোর সাড়ে ৪টার দিকে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে আলী আকবর (৫০) নামে এক বাংলাদেশি নিহত হন। ধসে পড়া মাটি তার বসতঘরের ওপর আছড়ে পড়লে তিনি ও পরিবারের আরও তিন সদস্য চাপা পড়েন। স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেছেন, সম্ভাব্য নতুন দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢাল থেকে বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সরে যেতে নিয়মিত মাইকিংসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী কয়েক দিন ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। এর ফলে কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস ও পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই সময়ে টানা বর্ষণের প্রভাবে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকাতেও ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। জেলা প্রশাসন শালবন, কলাবাগান ও সবুজবাগসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতামূলক প্রচার চালাচ্ছে। অপরদিকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে ভারতের ওডিশা, ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড়সহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর ওডিশার পাঁচ জেলায় রেড অ্যালার্ট জারি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। পাহাড়ি ঢালে গড়ে ওঠা অস্থায়ী আশ্রয়গুলো বর্ষাকালে দুর্বল হয়ে পড়ায় সামান্য অতিবৃষ্টিতেও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। যদিও কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং পাহাড়ের ঢাল শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে, তবুও বিপুল জনসংখ্যা ও সীমিত অবকাঠামোর কারণে চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। আবহাওয়ার বর্তমান পূর্বাভাস বিবেচনায় উদ্ধার ও সতর্কতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।
আমাদের আরও আপডেট পেতে চোখ রাখুন: ফেসবুক: facebook.com/DailyPerspective.tv ইউটিউব: youtube.com/@DailyPerspectivebd ওয়েবসাইট: dailyperspective.tv Instagram: instagram.com/dailyperspective.tv

