বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল এবং জীবনরেখাসমরূপ জলপথ হরমুজ প্রণালী আবারও বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে শনিবার দেওয়া এক কড়া বার্তায় সব বাণিজ্যিক জাহাজকে এই রুট এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তেহরানের এই আকস্মিক পদক্ষেপে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র ঝাঁকুনি লেগেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর সংকটের কালো মেঘ ঘনীভূত করছে।
সূচনা অনুচ্ছেদ: গত শনিবার ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিবাদের কারণ দেখিয়ে হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করে এবং সব জলযানকে রুটটি পরিহার করতে বলে। লেবাননে চলমান ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসন থামাতে ওয়াশিংটনের ব্যর্থতা এবং ১৭ জুনের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের প্রতিবাদে তেহরান এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ফলে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
সংকটের পেছনের প্রেক্ষাপট
চলতি বছরের ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে লেবাননসহ আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কূটনৈতিক মহলের আশা ছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির পায়রা উড়বে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে বিমান হামলা আরও তীব্র করে তোলে। তেহরানের স্পষ্ট অভিযোগ, ওয়াশিংটন তার মিত্র ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত বারবার পদদলিত হচ্ছে। এই কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার জবাব দিতেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে মারাত্মক প্রভাব
অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলার মতো তথ্য হলো, বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত তেলের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হয় এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই। রুটটি বন্ধ হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এই সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যে বিপর্যয় নামবে, তা সামলানো সহজ হবে না।
সামরিক উত্তাপ ও পাল্টা আঘাত
তেহরানের এই ঘোষণার রেশ কাটতে না কাটতেই মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র আরও তেতে ওঠে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরানের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। সেন্টকমের দাবি, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তবে ছেড়ে কথা বলেনি তেহরানও। আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। দুপক্ষের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে উভয় পক্ষেই হতাহতের খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও আগামী দিনের পথ
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থাগুলো উদ্ভূত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তেহরান তাদের অবস্থানে অনড় থেকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, অঞ্চলে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই জলপথ বন্ধ থাকবে। সাম্প্রতিক সময়ে ওমানের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা হলেও কোনো ফলপ্রসূ সমঝোতা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকেই বদলে দেবে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতির গতিপ্রকৃতিকেও দীর্ঘ মেয়াদে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেবে।
আমাদের আরও আপডেট পেতে চোখ রাখুন: ফেসবুক: facebook.com/DailyPerspective.tv ইউটিউব: youtube.com/@DailyPerspectivebd ওয়েবসাইট: dailyperspective.tv Instagram: instagram.com/dailyperspective.tv

