অটোয়া: কানাডা সরকার সাময়িকভাবে ‘প্যারেন্ট অ্যান্ড গ্র্যান্ডপ্যারেন্ট প্রোগ্রাম’ (পিজিপি)-এর আওতায় নতুন আবেদন গ্রহণ স্থগিত করেছে। ইমিগ্রেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা (আইআরসিসি) জানিয়েছে, আবেদনজট কমানো, প্রশাসনিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং অপেক্ষার সময় সহনীয় পর্যায়ে আনতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে প্রক্রিয়াধীন ৬০ হাজার ৫০০টি আবেদন স্বাভাবিক নিয়মে নিষ্পত্তি করা হবে এবং ২০২৬ ও ২০২৭ সালের জন্য নির্ধারিত ১৫ হাজার আবেদনকারীর স্থায়ী বাসিন্দা করার লক্ষ্যমাত্রাও অপরিবর্তিত থাকবে।
কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে পিজিপি। ১৯৯০-এর দশকে চালু হওয়া এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল অভিবাসীদের মা-বাবা, দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানিদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের সুযোগ করে দেওয়া। বর্তমানে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৩ শতাংশই প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী হওয়ায় কর্মসূচিটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
তবে বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ায় অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে গড়ে একটি আবেদন নিষ্পত্তি হতে প্রায় ৩৩ মাস সময় লাগছে। কুইবেক প্রদেশে এই সময়সীমা বেড়ে ৬৬ মাস পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে আবেদনকারীদের হতাশার পাশাপাশি প্রশাসনিক চাপও ক্রমেই বাড়ছিল।
আইআরসিসি স্পষ্ট করেছে, নতুন আবেদন আপাতত গ্রহণ করা না হলেও যারা ইতোমধ্যে আবেদন জমা দিয়েছেন কিংবা আগে থেকেই আবেদন করার আমন্ত্রণ পেয়েছেন, তারা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী আবেদন সম্পন্ন করতে পারবেন। তবে নতুন কোনো ড্র বা আমন্ত্রণ আপাতত দেওয়া হবে না। সরকারের ভাষ্য, এই বিরতি কর্মসূচির কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ পরিচালনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।
পিজিপির আওতায় স্পনসরশিপের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো স্পনসরের আর্থিক সক্ষমতা। আবেদনকারীর পক্ষে স্পনসরকে সর্বশেষ তিন বছরের আয়কর বিবরণী এবং নির্ধারিত ন্যূনতম আয়ের প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়। কিন্তু এসব শর্ত পূরণ করলেও দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেক পরিবার কাঙ্ক্ষিত পুনর্মিলনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ অবস্থায় অনেক অভিবাসী পরিবারের কাছে বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে ‘সুপার ভিসা’। এই ভিসার আওতায় মা-বাবা কিংবা দাদা-দাদিরা একবারে পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত কানাডায় অবস্থান করতে পারেন। যদিও এটি স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেয় না, তবুও পরিবারকে দ্রুত একত্রিত করার বাস্তবসম্মত উপায় হিসেবে সুপার ভিসার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অভিবাসী সহায়তাকারী বিভিন্ন সংস্থাও এটিকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে প্রচার করছে। এরই মধ্যে সুপার ভিসার আবেদন প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, পিজিপি স্থগিতের সিদ্ধান্ত স্থায়ী নয়। ভবিষ্যতে আবেদন প্রক্রিয়ায় আরও বেশি ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয়তা এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করে কর্মসূচিটি পুনরায় চালু করা হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সময়সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় উদ্বেগও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কানাডায় দক্ষ অভিবাসীদের অনেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন। সে কারণে এই কর্মসূচিতে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা দেশটিকে স্থায়ী আবাস হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আইআরসিসি জানিয়েছে, আবেদন নিষ্পত্তির গতি বাড়াতে ইতোমধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, জনবল সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত নতুন আবেদন গ্রহণ স্থগিতই থাকবে। এ সময়ে পূর্বে জমা পড়া আবেদনগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হবে এবং যোগ্য ব্যক্তিদের সুপার ভিসার সুযোগ বিবেচনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে প্রবাসী সম্প্রদায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ দীর্ঘ প্রতীক্ষা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ সুপার ভিসাকে কার্যকর অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে দেখছেন। অভিবাসী সংগঠনগুলো সরকারের কাছে দ্রুত একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ এবং পুনরায় আবেদন গ্রহণের রূপরেখা ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছে।
আগামী মাসগুলোতে আইআরসিসি পিজিপির নীতিমালা পুনর্মূল্যায়ন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রদেশ নিজস্ব উদ্যোগে সীমিত পরিসরে স্পনসরশিপ কর্মসূচি পরিচালনা করলেও ফেডারেল পর্যায়ে পিজিপিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। এ কারণে সাময়িক এই স্থগিতাদেশ রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী দলগুলো সরকারের সমালোচনা করলেও আইআরসিসি বলছে, দীর্ঘমেয়াদে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও মানবিক অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আমাদের আরও আপডেট পেতে চোখ রাখুন: ফেসবুক: facebook.com/DailyPerspective.tv ইউটিউব: youtube.com/@DailyPerspectivebd ওয়েবসাইট: dailyperspective.tv Instagram: instagram.com/dailyperspective.tv

