পবিত্র কোরআন কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের গ্রন্থ নয়; এটি মানবজীবনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, নির্ভুল হিসাব এবং জবাবদিহিতার গুরুত্বও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে সংখ্যা, সময়, পরিমাপ ও হিসাবের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা ইসলামের বিধান, মানবসভ্যতার অগ্রগতি এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, কোরআনে হিসাব ও পরিসংখ্যানের গুরুত্ব প্রধানত তিনটি স্তরে প্রতিফলিত হয়েছে—ঈমানি শিক্ষা, শরিয়তভিত্তিক বিধান এবং সভ্যতার বিকাশে এর বাস্তব প্রয়োগ। এসব শিক্ষা শুধু ধর্মীয় আচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সুশাসন, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
কোরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা তাঁর সর্বজ্ঞতা ও নিখুঁত হিসাব সংরক্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। সুরা আন-নাবায় বলা হয়েছে, প্রতিটি বিষয়ই লিপিবদ্ধ রয়েছে। একইভাবে সুরা আল-কামারে ঘোষণা করা হয়েছে, সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস্তু নির্ধারিত পরিমাপে সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের প্রতিটি কাজ, কথা, পদক্ষেপ এমনকি অন্তরের নিয়তও আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয় এবং সবকিছুরই সুনির্দিষ্ট হিসাব সংরক্ষিত থাকে।
কিয়ামতের দিনের জবাবদিহিতার প্রসঙ্গেও কোরআনে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। সুরা আল-কাহফে উল্লেখ করা হয়েছে, সেদিন মানুষের আমলনামা সামনে উপস্থাপন করা হবে এবং নিজেদের কর্মফল দেখে অপরাধীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়বে। ইসলামী আকিদায় এটি ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ ও নৈতিক জবাবদিহিতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
ইসলামী শরিয়তের বিভিন্ন বিধানেও সংখ্যা ও পরিমাপের ব্যবহার অত্যন্ত সুস্পষ্ট। উত্তরাধিকার বা মিরাস বণ্টনের ক্ষেত্রে কোরআনে নির্দিষ্ট গাণিতিক অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে। সুরা আন-নিসায় পুত্র ও কন্যার অংশ বণ্টনের বিধান তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। একইভাবে ইদ্দত, দিয়াত এবং কাফফারার মতো বিধানেও নির্ধারিত সংখ্যা ও সময়সীমা অনুসরণের নির্দেশ রয়েছে। তালাকপ্রাপ্ত নারীর ইদ্দতের সময়, কাফফারা হিসেবে নির্দিষ্টসংখ্যক দরিদ্রকে আহার করানো কিংবা ধারাবাহিক রোজা রাখার বিধান—সবই সুনির্দিষ্ট হিসাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
সময়ের সঠিক গণনার গুরুত্বও কোরআনে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সুরা আত-তাওবায় বছরের মাসসংখ্যা ১২টি নির্ধারণের কথা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে সুরা ইউনুসে বলা হয়েছে, মানুষ যেন বছরের সংখ্যা ও সময়ের হিসাব জানতে পারে। এসব নির্দেশনা ধর্মীয় ইবাদতের সময় নির্ধারণের পাশাপাশি সামাজিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও সময়ের গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।
কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাতেও সংখ্যার ব্যবহার লক্ষণীয়। আসহাবে কাহফের গুহাবাসের সময়কাল ৩০০ বছর এবং অতিরিক্ত ৯ বছর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরশ বহনকারী ফেরেশতা, জাহান্নামের প্রহরী এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের বিধানেও নির্দিষ্ট সংখ্যার ব্যবহার কোরআনের গণনাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সুস্পষ্ট করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বিশ্বে উন্নয়ন, নীতিনির্ধারণ, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, জাকাত ব্যবস্থাপনা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ভুল তথ্য ও পরিসংখ্যানের কোনো বিকল্প নেই। এ বাস্তবতায় কোরআনের হিসাবভিত্তিক শিক্ষা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটাবিজ্ঞান এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিনির্ভর বর্তমান সময়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ রাষ্ট্র পরিচালনা এবং টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান।
পর্যবেক্ষকদের মতে, অনেক মুসলিম দেশে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে নীতিনির্ধারণে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী আগে কোরআন নির্ভুল হিসাব, পরিমাপ এবং জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলিম পণ্ডিতদের গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও পরিসংখ্যানে অসামান্য অবদানের পেছনেও কোরআনের এই জ্ঞানচর্চার প্রেরণাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, কোরআনের শিক্ষা কেবল তিলাওয়াত বা ধর্মীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর পূর্ণ তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সঠিক হিসাব, স্বচ্ছতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই কোরআনের এই শিক্ষা বাস্তব অর্থে প্রতিফলিত হতে পারে। এ মূল্যবোধই একটি সুশৃঙ্খল, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত সভ্যতা নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি।
আমাদের আরও আপডেট পেতে চোখ রাখুন: ফেসবুক: facebook.com/DailyPerspective.tv ইউটিউব: youtube.com/@DailyPerspectivebd ওয়েবসাইট: dailyperspective.tv Instagram: instagram.com/dailyperspective.tv

